শিব্বীর আহমেদ, নিউইয়র্ক — বিশ্বের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আসায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
রোববার নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় গুতেরেস বলেন, ১৯৪৫ সালের বিশ্বের সঙ্গে বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক, জনমিতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোতেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
গুতেরেস বলেন, “আজকের অর্থনৈতিক, জনমিতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ১৯৪৫ সালের মতো নয়। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।”
ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলোই বিশ্বে পরিবর্তিত ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতিচ্ছবি বলে উল্লেখ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, বিশ্ব ক্রমেই একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
গুতেরেসের মতে, বহুমেরুকেন্দ্রিকতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আরও ভারসাম্য ও ন্যায্যতা আনতে পারে। তবে এর জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং ব্রেটন উডস ব্যবস্থার আওতাধীন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক কাঠামোতে সংস্কার আনতে হবে, যাতে সেগুলো বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির জন্য চারটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন গুতেরেস—অর্থায়ন, প্রযুক্তি, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং শান্তি।
উন্নয়ন অর্থায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ব্যাপক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোকে আরও “বড়, উন্নত ও সাহসী” ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গে গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, এই প্রযুক্তির সুফল এখনো অল্পসংখ্যক কোম্পানি ও কয়েকটি দেশের মধ্যে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এআইয়ের বৈষম্য বাড়তে থাকলে আয়, সুযোগ, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব—সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য আরও গভীর হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তীব্র তাপপ্রবাহ, হিমবাহের দ্রুত গলন, ভয়াবহ দাবানল ও বিধ্বংসী বন্যাকে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু সংকটের লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বিশ্ব যখন শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার সীমার কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে, তখন শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ধনী দেশগুলোকে তাদের জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানিয়ে গুতেরেস অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানো এবং জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য আরও বেশি সহায়তার ওপর জোর দেন। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়েও তিনি কঠোর সমালোচনা করেন এবং সম্পদ লুটপাট বন্ধের আহ্বান জানান।
শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে গুতেরেস গাজা, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও সুদানের সংঘাতের কথা তুলে ধরেন। তিনি দেশগুলোর প্রতি জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি মেনে চলার আহ্বান জানান। এর মধ্যে রয়েছে সার্বভৌম সমতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কারকে উদীয়মান শক্তিগুলোর প্রতি কোনো ছাড় হিসেবে না দেখে সব দেশের যৌথ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান গুতেরেস।
তিনি বলেন, বিশ্ব যখন অপরিবর্তনীয়ভাবে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে এমন একটি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করতে সব দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যা সবার জন্য কার্যকর হয়।
ভারতের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এবারের ব্রিকস সম্মেলনে বিশ্বের প্রধান উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর নেতাদের পাশাপাশি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ছিল সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।


