পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশে বিশেষ নিরাপত্তার আয়োজন করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানী ঢাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে মহাসড়কের যানজট নিরসন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা মোকাবেলায় এবার প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে রাজধানীকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) যৌথভাবে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
অন্যদিকে ছুটির চাপ থাকলেও এবারও কমসংখ্যক পুলিশ সদস্যদের ছুটি দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল ও আশপাশের এলাকায় ৩২টি টিম মোতায়েন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার দুপুরে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান র্যাব-১০-এর অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।
তিনি জানান, ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর সদরঘাট, সায়েদাবাদ, শ্যামপুর, সূত্রাপুর ও কামরাঙ্গীর চরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে র্যাবের ৩২টি টিম নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করবে। এর বাইরে সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও গোয়েন্দা নজরদারির জন্য মাঠে থাকবে আরো ছয়টি সিভিল টিম।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিটের কালোবাজারি বা যাতায়াতের সময় কোনো প্রকার হয়রানির শিকার হলে যাত্রীরা সরাসরি কন্ট্রোল রুমে এসে বা ফোনের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন। র্যাব জানিয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এই জামাতকে কেন্দ্র করে ডিএমপি গ্রহণ করেছে ৪ স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ডিএমপি সূত্র জানায়, ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকবে। পুরো ঈদগাহ এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকবে এবং অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম থেকে মনিটরিং করা হবে।
নিরাপত্তার স্বার্থে এবার মুসল্লিদের জায়নামাজ ছাড়া কোনো প্রকার ব্যাগ বা সামগ্রী সঙ্গে না আনতে অনুরোধ করা হয়েছে। প্রত্যেক মুসল্লিকে আর্চওয়ে গেটের মাধ্যমে তল্লাশি শেষ করে ঈদগাহে প্রবেশ করতে হবে। এবার ঈদযাত্রায় সবচাইতে বড় চমক হচ্ছে দ্রুত উদ্ধারকাজ নিশ্চিত করতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, মহাসড়ক বা রেলপথে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করতে সশস্ত্র বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেলিকপ্টার ইউনিটগুলো সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। অতীতে দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজে যে বিলম্বের অভিযোগ ছিল, তা নিরসনে এবার আকাশপথ ব্যবহারের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ ১৫৫টি স্পটে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে যান চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে প্রয়োজনে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। যানজট প্রবণ এলাকা যেমন পদ্মা ও যমুনা সেতুর টোল প্লাজাগুলোতে দ্রুত টোল আদায়ের ব্যবস্থা এবং কোনো গাড়ি বিকল হলে তা সরিয়ে নিতে অতিরিক্ত রেকার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি এএইচএম শাহাদাত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদের নিরাপত্তায় সব ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধারের জন্য হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ফাঁকা ঢাকায় টহল জোরদার করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় ড্রোন উড়ানো প্রয়োজন সেখানে উড়ানো হবে।’
পুলিশ জানায়, ঈদে প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে রাজধানী প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়বে। এই সুযোগে ফাঁকা বাসাবাড়িতে চুরি, ছিনতাই বা ডাকাতির মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডিএমপি সূত্র জানায়, ফাঁকা ঢাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হচ্ছে এবং গলি পথগুলোতেও পুলিশ সাদা পোশাকে ও ইউনিফর্মে নজরদারি করবে। ডিএমপি থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কোনো এলাকায় অপরিচিত ব্যক্তির সন্দেহজনক আনাগোনা, বারবার মোটরসাইকেলে ঘোরাফেরা কিংবা অস্বাভাবিক জমায়েত দেখলে স্থানীয় বাসিন্দারা যেন একত্রিত হয়ে তাদের পরিচয় জানার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক মনে হলে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করতে বা নিকটস্থ থানায় অবহিত করতে অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রতিবছর ঈদযাত্রায় টিকিট নিয়ে কালোবাজারি একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এবার এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে সরকার। টার্মিনালগুলোতে বিশেষ নজরদারি টিমের পাশাপাশি গোয়েন্দা সদস্যরা সক্রিয় থাকবেন। কোনো অবস্থাতেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করতে দেওয়া হবে না বলে পুলিশ ঘোষণা দিয়েছে।
অন্যদিকে, ঈদকে সামনে রেখে সীমান্তেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে ঈদ উৎসবের আড়ালে মাদক বা অবৈধ চোরাচালান না বাড়তে পারে। সম্প্রতি র্যাবের আভিযানিক তৎপরতায় বিদেশি পিস্তল, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এবং বড় অংকের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। নৌপথে যেকোনো দুর্ঘটনা সামাল দিতে ডুবুরি দল, রেসকিউ বোট এবং আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় কোস্টগার্ডের টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। হাইওয়ের পাশের ট্রমা সেন্টার ও হাসপাতালগুলোকে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।