১৯৮৫ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার ১৮২ নম্বর ফ্লাইটে বোমা হামলার তদন্তের পরিধি কমানোর উদ্যোগের খবরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনেরা। তাদের আশঙ্কা, কানাডার রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) দীর্ঘদিনের এই তদন্তকে আরো ছোট পরিসরে নিয়ে যেতে পারে।

এমনকি তদন্তটি কার্যত ‘নিষ্ক্রিয়’ করে রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।

 

এনডিটিভি জানায়, এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চলতি মাসের শুরুতে টরন্টোতে একটি বৈঠক হয়। পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুরোধে ১২ সেপ্টেম্বর ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তদন্তের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয় বলে এনডিটিভি জানতে পেরেছে।

নিহতদের স্বজনেরা বলছেন, চার দশকের বেশি সময় ধরে তারা এই হামলার উত্তর খুঁজছেন। তাই তদন্ত কমানোর সম্ভাবনার কথা শুনে তারা হতবাক।  ১৯৮৫ সালের ওই বোমা হামলায় ৩২৯ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ২৬৮ জন ছিলেন কানাডার নাগরিক।
কানাডার কর্তৃপক্ষ এখনো ঘটনাটিকে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করে।

 
 

নিহতদের পরিবারের পক্ষে সর্বশেষ উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন কানিষ্কা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সঞ্জয় লাজার। হামলায় তিনি তার বাবা, মা ও ছোট বোনকে হারিয়েছেন। তদন্ত বন্ধ বা কমিয়ে দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করে তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনিকে চিঠি দিয়েছেন। ১৬ সেপ্টেম্বর লেখা ওই চিঠির একটি কপি এনডিটিভি পেয়েছে।

লাজারের চিঠি অনুযায়ী, ১২ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে পরিবারগুলোকে জানানো হয়, এয়ার ইন্ডিয়া তদন্তকারী দলের সদস্যসংখ্যা কমানোর কথা ভাবছে আরসিএমপি। একই সঙ্গে তদন্তকে ‘নিষ্ক্রিয়’ অবস্থায় নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।পরিবারগুলোর কাছে এই খবর নতুন করে পুরোনো ক্ষত সামনে এনেছে।

 

লাজার বলেন, ফৌজদারি মামলার বিচার শেষ হওয়ার পর গত ২০ বছরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এটাই ছিল প্রথম এ ধরনের বৈঠক। সেখানে তদন্তের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তাতে পরিবারগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে আরসিএমপি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত বন্ধ করেছে—এমন তথ্য এখনো সামনে আসেনি। পরিবারের সদস্যরা মূলত পুলিশ যে সম্ভাব্য পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে, তা নিয়েই আপত্তি জানিয়েছেন। ১৯৮৫ সালের ২৩ জুন এয়ার ইন্ডিয়ার ১৮২ নম্বর ফ্লাইটটি কানাডার মন্ট্রিয়ল থেকে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। আয়ারল্যান্ডের উপকূলের কাছে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর উড়োজাহাজটিতে বোমা বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণে উড়োজাহাজে থাকা ৩২৯ জনই নিহত হন। নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন কানাডার নাগরিক। ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশের নাগরিকও ওই ফ্লাইটে ছিলেন।
 

ঘটনাটি কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে পরিচিত। একই সময় জাপানের নারিতা বিমানবন্দরেও একই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। সেখানে দুজন লাগেজকর্মী নিহত হন। পরে দুটি ঘটনাই একটি বড় আন্তর্জাতিক তদন্তের অংশ হয়ে ওঠে। কানিষ্কা হামলার তদন্ত শুধু বোমা বিস্ফোরণের জন্য দায়ীদের খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই ঘটনার আগে কানাডার গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কীভাবে হুমকির তথ্য মোকাবিলা করেছিল, সেটিও তদন্তের বিষয় ছিল। পরে কানাডার সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি জন মেজরের নেতৃত্বে একটি প্রকাশ্য তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন হামলার আগে ও পরে কানাডার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় কী ধরনের ভুল হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখে। কানাডা সরকার পরে স্বীকার করে, এই তদন্তে দেশটির নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যর্থতা চিহ্নিত হয়েছিল।

নিহতদের পরিবারের বর্তমান উদ্বেগ ১৯৮৫ সালে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে নয়। তাদের প্রশ্ন হলো, এখন তদন্তের ভবিষ্যৎ কী হবে। লাজারের চিঠি অনুযায়ী, আরসিএমপি তদন্তকারী দলের আকার কমানোর কথা ভাবছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের তদন্তকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিবারগুলোর প্রশ্ন, এত বছর ধরে তদন্ত চলার পর এখন সেটি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হবে। তাদের বক্তব্য, তারা চায় না শুধু সময় পার হয়ে যাওয়ার কারণে মামলাটি গুরুত্ব হারাক। তারা চাইছে, তদন্তের সব যুক্তিসংগত পথ সত্যিই শেষ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা হোক। কানাডার পুলিশ এর আগে এই তদন্তকে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও জটিল তদন্তগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছে।
 

২০২৫ সালে হামলার ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আরসিএমপি জানায়, তদন্তে শত শত কর্মকর্তা কাজ করেছেন। তারা বিভিন্ন দেশে গিয়ে তদন্ত করেছেন, প্রমাণ পরীক্ষা করেছেন, উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষ পুনর্গঠন করেছেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে চলা তদন্তের পর এখন এর পরিধি কমানোর সম্ভাবনা তাই পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিহতদের পরিবারের ক্ষোভের আরেকটি কারণ হলো, তাদের নতুন তথ্য বা সূত্র দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে যে আলোচনা হয়েছে। লাজার তার চিঠিতে বলেছেন, কয়েক দশকের তদন্তের পরও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নতুন সূত্র চাওয়া তাদের জন্য কষ্টদায়ক। পরিবারগুলোর প্রশ্ন, চার দশকের তদন্তের পরও কি এখন তাদের কাছ থেকেই এমন তথ্য আশা করা হচ্ছে, যা তদন্তকারীরা নিজেরা খুঁজে বের করতে পারেননি?

তবে পরিবারগুলোর বক্তব্য এমন নয় যে প্রমাণ থাকুক বা না থাকুক, তদন্ত অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যেতে হবে। তারা বলছে, তদন্ত কমিয়ে বা বন্ধ করার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে অনুসন্ধানের সব যুক্তিসংগত পথ শেষ হয়ে গেছে।  কানিষ্কা হামলার বিচারপ্রক্রিয়াও ছিল দীর্ঘ ও জটিল। জন মেজর কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ঘটনায় দুটি ফৌজদারি বিচার হয়েছিল। বিস্ফোরণের ঘটনায় ইন্দরজিৎ সিং রেয়াত দোষী সাব্যস্ত হন।  তবে ২০০৫ সালে আরো দুই আসামি খালাস পান। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এরপর এই ঘটনায় আর কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। নিহতদের অনেক স্বজনের কাছে এই ফলাফল পুরোপুরি সন্তোষজনক ছিল না। কারণ, হামলার পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক ও সব দায়ী ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনা যায়নি বলে তারা মনে করেন।
 

লাজারের চিঠিতে তদন্তের সময়কার কিছু ব্যর্থতার অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, তদন্তের সময় কিছু প্রমাণ হারিয়ে গিয়েছিল। নজরদারির কিছু রেকর্ডিং মুছে ফেলা হয়েছিল। কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী পরে মারা যান বা হুমকির মুখে পড়েন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পরিবারগুলোর বক্তব্য, এসব কারণে হামলার সঙ্গে জড়িত আরো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সরকারি তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলোর কিছু পরিবারের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগ বা ব্যাখ্যা। তবে এসব বিষয়ই তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে পরিবারের যুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লাজারের চিঠিতে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন করে তথ্য সংগ্রহের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৯৯৫ সালে কানাডা সরকার ও আরসিএমপি হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য দিতে ১০ লাখ ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। এখনো কেউ সেই পুরস্কার দাবি করেনি। লাজার চান, পুরস্কারটি আবার চালু করা হোক এবং এর অর্থের পরিমাণ বাড়ানো হোক। একই সঙ্গে জনগণের কাছ থেকে নতুন করে তথ্য চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। পরিবারগুলোর যুক্তি, বর্তমান তদন্তকারী দল যদি মনে করে তাদের হাতে থাকা সূত্রগুলো শেষ হয়ে গেছে, তাহলে তদন্ত বন্ধ না করে নতুন তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
 

লাজার আরো বলেছেন, আরসিএমপির বর্তমান দল যদি মনে করে তারা তদন্ত আর এগিয়ে নিতে পারছে না, তাহলে অন্য কোনো তদন্তকারী দল বা অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। দায়ীদের শনাক্ত করতে কানাডার পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, বর্তমান তদন্তের সীমাবদ্ধতার কারণে ১৯৮৫ সালের হামলার অনুসন্ধান থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়। লাজার তার চিঠিতে সাবেক কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের দেওয়া আশ্বাসের কথাও উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, হারপার নিহতদের পরিবারের প্রতিনিধিদের বলেছিলেন, হামলার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করতে কানাডার কর্তৃপক্ষ কাজ চালিয়ে যাবে। মামলাটি যৌক্তিক পরিণতিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত চেষ্টা অব্যাহত রাখার কথাও বলা হয়েছিল। এখন একই বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনির কাছে আবেদন জানিয়েছেন লাজার।

চিঠির অনুলিপি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কানাডার জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী, কানাডা ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল এবং আরসিএমপির শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে। কানিষ্কা হামলা কানাডার কাছে শুধু ৪১ বছর আগের একটি বিমান দুর্ঘটনা নয়। এটি দেশটির সন্ত্রাসবাদ, গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। হামলার ৪১তম বার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি ৩২৯ জন নিহতকে স্মরণ করেন। তিনি ঘটনাটিকে কানাডার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করেন।
 

অন্যদিকে আরসিএমপিও এর আগে স্বীকার করেছে, এই তদন্তের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং নিহতদের পরিবারের সহায়তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতা সামনে এসেছিল। এ কারণেই তদন্তের পরিধি কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিহতদের পরিবারের মূল দাবি হলো, তদন্ত কমিয়ে দেওয়ার আগে নিশ্চিত করতে হবে যে সম্ভাব্য সব পথ অনুসন্ধান করা হয়েছে। ৪১ বছর পরও তাদের কাছে প্রশ্নটি একই—কানিষ্কা হামলার সব দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা গেছে কি না এবং যদি না যায়, তাহলে তদন্ত থামিয়ে দেওয়ার সময় এখনো কি এসেছে?