দীর্ঘ এক মাস নয় দিন ধরে চলা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শেষ হয়েছে। সমাপনী বক্তব্যে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সত্যিকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রাণবন্ত আলোচনায় একটি ঐতিহাসিক ও সর্বজনীন বাজেট পাসের গৌরবময় অর্জনকে জাতির সামনে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

 

একইসঙ্গে দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, প্রান্তিক কৃষক, শিশু এবং পর্যটন খাতসহ বিভিন্ন খাতের সামগ্রিক উন্নয়নের রূপরেখা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয় এই অধিবেশনে। 

অন্যদিকে, জাতীয় সংসদকে দেশের মজলুম ও সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ‘মিলনমেলা’ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে সুষম উন্নয়ন, অর্থ অপচয় রোধ ও দুর্নীতি দমনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। 

 

অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে দেশের সাধারণ মেহনতি মানুষ ও পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

তিনি জানান, বর্তমানে চালু থাকা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড, প্রবাসী কার্ড কিংবা ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় গুরুদের জন্য দেওয়া বিশেষ কার্ডসহ সমস্ত সুযোগ-সুবিধাগুলোকে ক্রমান্বয়ে একটি মাত্র সর্বজনীন ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে এসে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করা হবে। এর ফলে দেশের প্রতিটি নাগরিক একটি মাত্র সর্বজনীন কার্ডের মাধ্যমে সমস্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে ও দায় মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র এবং জনগণ উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এই সামাজিক সুরক্ষামূলক উদ্যোগগুলো জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের কোনো করুণা বা দয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের ওপর অর্পিত পরম দায়িত্ব ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার।

দেশের অর্থনীতি ও কৃষিখাতের উন্নয়নে প্রান্তিক কৃষকদের ওপর থেকে ঋণের বোঝা কমাতে বর্তমান সরকারের প্রথম ক্যাবিনেট মিটিংয়েই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বকেয়া থাকা সমস্ত কৃষি ঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ মওকুফ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সারা দেশের প্রায় ১৩ লক্ষ প্রান্তিক কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন এবং তাদের মাথার ওপর থেকে ঋণের বিশাল বোঝা নেমে গেছে।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের সিংহভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সমঙ্গে জড়িত। তাই এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্ভব। ফ্যামিলি কার্ডের মতো কল্যাণমুখী সামাজিক পলিসিকে দলমত নির্বিশেষে সমর্থন জানানোর জন্য তিনি বিরোধীদলীয় নেতাসহ বিরোধী দলের সকল সংসদ সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং বলেন, দেশের প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলকে সব সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।

দেশের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক মানের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতকে পুনর্গঠনে বিশেষ জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সরাসরি অভিযোগ করেন যে, বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে একটি ‘বিশেষ দেশকে’ সুপরিকল্পিতভাবে একচেটিয়া বাণিজ্য ও সুবিধা দেওয়ার জন্য এবং একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে খুশি করতে এ দেশের শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

মিশরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত দেওয়াল লিখনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, কোনো জাতিকে যদি ধ্বংস করতে হয়, তবে অন্য কোনো অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, শুধু তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিলেই চলে। স্বৈরাচার মনেপ্রাণে সেই নীতিই এ দেশে প্রয়োগ করেছিল। তবে বর্তমান সরকার এই জাতীয়তাবিরোধী ধ্বংসাত্মক নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী এবং এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আধুনিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে বিতর্কিত সিলেবাস পরিবর্তন, শিক্ষার উপকরণ নিশ্চিতকরণ ও শিক্ষকদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমিকভাবে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

একইভাবে বিগত স্বৈরাচারের তোষণ নীতির কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া চিকিৎসা খাতকে পুনরায় সচল করতে এবং তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চলতি বাজেটে ১.২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হলেও আগামী পাঁচ বছরে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশের প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং উন্নত বিশ্বের মতো রোগ প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে সরকার খুব শিগগিরই দেশজুড়ে এক লক্ষ ‘হেলথকেয়ার কর্মী’ নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে। এছাড়া গ্রামীণ অঞ্চলের শিশুদের বিশেষায়িত সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই দেশের পাঁচটি বিভাগে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি অত্যাধুনিক বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করা হবে, যার ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের উন্নত চিকিৎসার জন্য আর রাজধানীমুখী হতে হবে না।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে পূর্ববর্তী সরকারের আমলের ৩ লক্ষ কোটি টাকার ভয়াবহ হরিলুট ও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকার অপচয়ের কড়া সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিগত আমলে রাষ্ট্রীয় গ্যাস অনুসন্ধান সংস্থা বাপেক্সকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর করে পুরো গ্যাস সেক্টরকে বিদেশীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা ফিরিয়ে আনতে বাপেক্সকে পুনরায় সক্রিয় করছে এবং সংস্থাটির জন্য নতুন রিগ আমদানিসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে, যার ফলে এখন থেকে বাপেক্স নিজেই দেশের অভ্যন্তরে নতুন নতুন গ্যাসকূপ খনন করতে সক্ষম হবে। 

এছাড়া, মাত্র তিন মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের সাথে সফল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সরকার আপৎকালীন জ্বালানি তেলের মজুদকে ৩০ দিনের কম সময় থেকে বাড়িয়ে ৪৫ দিনের ওপরে নিয়ে গেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে একে ৯০ দিনে উন্নীত করার কাজ চলমান রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযোগ্য মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে একটি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নিখুঁত, নির্ভুল ও সর্বজনগ্রাহ্য তালিকা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে কাজ করছে। 

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় কর্মীদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে অনেক ‘ভুয়া’ ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ সরকারি ভাতা দেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা কঠোরভাবে বন্ধ করা হবে। দেশের বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সব ধরনের রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ঐতিহাসিক সত্যভিত্তিক চূড়ান্ত ও প্রকৃত তালিকা জাতির সামনে প্রকাশ করা হবে। যেহেতু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া, তাই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও বীর শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করাকে বর্তমান সরকার একটি পবিত্র ও প্রধান কর্তব্য বলে মনে করে।

সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সম্পদ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, অতীতে বা বর্তমানে এই বন্দরে যেকোনো ধরনের দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হয়ে থাকলে দায়ীদের অবশ্যই দেশের প্রচলিত কঠোর আইনের আওতায় আনা হবে। বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা ব্যাপক বৃদ্ধির পাশাপাশি ডিজিটাল উইন্ডো ও ই-গেট পাস চালু করা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা চালু হলে বড় মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি জেটিতে আসতে পারবে এবং ট্রান্সশিপমেন্ট খরচ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়ে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বৈপ্লবিক গতি আসবে। 

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের পার্ক ও খেলার মাঠের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করার জন্য উচ্ছেদ অভিযান ভবিষ্যতেও কঠোরভাবে চলমান থাকবে এবং শিশুদের পর্যাপ্ত খেলার উন্মুক্ত মাঠ নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি জানান।

উন্নত প্রযুক্তি ও স্থানীয় শিল্পের বিকাশে দেশীয় বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে বিশ্ব দরবারে আরও শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন ও সংযোজনে যুগোপযোগী শুল্ক সুবিধা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, অল-ইন-ওয়ান পিসি, রাউটার ও মোবাইলসহ বিভিন্ন আইটি পণ্য দেশে উৎপাদনের সুবিধার্থে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস শুল্ক, সমুদয় সম্পূরক শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। সংযোজনের ক্ষেত্রেও বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেওয়ার ফলে দেশের বাজারে উন্নত প্রযুক্তি পণ্য অনেক কম দামে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হবে, যা দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ ও আইটি সেক্টরে অভূতপূর্ব কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

দেশের পর্যটন শিল্পকে টেকসই ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে কক্সবাজারসহ দেশজুড়ে পর্যটনের একটি বৃহৎ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কক্সবাজারকে বিশ্বমানের আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মালিকানাধীন ১৩২.৪৪ একর জমিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে কক্সবাজারে একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার, সিলেট ও খুলনায় আন্তর্জাতিকমানের হোটেল ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্মাণের প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও যাতায়াত সহজ করতে প্রধান বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে ইনফরমেশন সেন্টার, এলইডি বোর্ড ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ নানামুখী আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন, তিন বছর আগে দেশের মানুষের সাথে দীর্ঘ সংলাপের মাধ্যমে তৈরি করা ৩১ দফা রূপরেখা আজ দেশের ১৮ কোটি মানুষের মুক্তির সনদে পরিণত হয়েছে। সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নির্বাচনের পূর্বে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’-এর প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে সরকার সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে ১০ হাজার নতুন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগসহ প্রতিটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বাজেট অধিবেশনটি সফল করতে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করায় সংসদ সচিবালয়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী, সার্জেন্ট অব আর্মস, বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার, গণপূর্ত বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সহায়কদের রেওয়াজ অনুযায়ী তাদের চলতি এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বিশেষ সম্মানী ভাতা হিসেবে প্রদানের জন্য স্পিকারকে অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী। দেশের মানুষের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষাকে পবিত্র আমানত ঘোষণা করে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জবাবদিহিমূলক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ঐতিহাসিক প্রথম বাজেট অধিবেশন সমাপ্ত হয়।

এদিকে দেশে চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি দেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। তিনি চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ২০২৬-এর পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচটি জেলায় পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছিল। এছাড়া প্রতিকূলতার কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তারা স্থগিত হওয়া বিষয়ের পরীক্ষার সাথে একই অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার বিশেষ সুযোগ পাবেন। এছাড়া পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নপত্র প্রণয়নের দায়ে অভিযুক্তদের ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং পরীক্ষার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে ওই ভুলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সকল শিক্ষার্থীকে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নে পূর্ণ নম্বর প্রদান করা হবে বলে শিক্ষামন্ত্রী নিশ্চিত করেন।

এছাড়া, দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন করতে কোনো দীর্ঘ আলোচনা ও স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো ছাড়াই মাত্র ২৮ মিনিটে ‘ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ বিল’ জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। বিলটি উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সাধারণত বিল উত্থাপনের পর তা স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হলেও অধিবেশনের শেষ দিনের কারণে তা সরাসরি পাসের প্রস্তাব করা হয়। এ নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ২৮ মিনিট ধরে তীব্র বিতর্ক হয়। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান ও হাসনাত আব্দুল্লাহ তড়িঘড়ি করে বিল পাসের তীব্র সমালোচনা করে এটিকে সংসদের জন্য একটি খারাপ নজির ও আইনপ্রণেতা হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার শামিল বলে আখ্যায়িত করেন।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি কোনো নতুন জটিল আইন নয়; বরং বাংলাদেশে বিনিয়োগে ওভারল্যাপিং ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ‘ওয়ান উইন্ডো’ সার্ভিস নিশ্চিত করার জন্য পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, পিপিপি কর্তৃপক্ষ এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ প্রতিষ্ঠা করাই এই বিলের মূল লক্ষ্য। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, পরবর্তীতে বিরোধী দলের উত্থাপিত যৌক্তিক সংশোধনীগুলো অবশ্যই বিবেচনা করা হবে। নবগঠিত এই ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের গভর্নিং বোর্ডের সভাপতি হবেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী।

বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান জাতীয় সংসদকে অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দেশের মানুষের ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার ওপর তাগিদ দেন। তড়িঘড়ি করে বিল পাসের সংস্কৃতির অবসান চেয়ে তিনি বলেন, ইতিহাস ও জনগণের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে, তাই আইন বুঝে-শুনে ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রণয়ন করতে হবে। তিনি সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহতদের পরিবারকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ঢাকাকে দেশের ‘চেহারা’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি রাজধানী ঢাকাকে জলাবদ্ধতামুক্ত ও তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ বরাদ্দ রাখা এবং একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষায় নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা নিশ্চিত করা, যোগ্যতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে এমপিওভুক্তি করা এবং সরকারি অর্থ অপচয় করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যক্তি বা রাজনীতিকের নামের নামফলক বসানোর প্রাচীন অপরাজনীতি চিরতরে বন্ধ করার কঠোর দাবি জানান তিনি।